শিশুর স্বাস্থ্য নিয়ে ভয়! আপনার শিশুকে দিন একটি পরিপূর্ণ খাদ্যাভাস

শিশুর সুস্বাস্থ্য নিয়ে আসে তার  ভবিষ্যতের নিশ্চয়তা। শিশু বয়সের ছোটখাটো যেকোনো রোগ বড় হয়ে দেখা দিতে পারে ভয়াবহ কোনো রোগের কারণ হিসেবে। শিশুদের খাদ্যাভ্যাসে অবহেলা শিশুদের শরীর ও মনের উপর ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে। পরিসংখ্যানে দেখা যায় বাংলাদেশে ৯.৫ মিলিয়নেরও বেশি শিশু পুষ্টিহীনতায়  ভুগছে। আর শতকরা ৫৬ ভাগ শিশু ওজনহীনতায় ভুগতে থাকে। তাই, শিশু বয়সে একটি উপযুক্ত খাদ্যাভ্যাস গড়ে তোলা একান্ত প্রয়োজন।

শিশুর স্বাস্থ্যের উপর পুষ্টিকর খাদ্যের  কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রভাবসমূহ হচ্ছেঃ

  • শারীরিক বৃদ্ধিঃ প্রথম ৫ বছর বয়স পর্যন্ত শিশুর শারীরিক বৃদ্ধির হার থাকে সবচেয়ে বেশি। এসময়ে পুষ্টিকর খাদ্য শিশুর জন্যে আবশ্যক।
  • ওজন নিয়ন্ত্রণঃ শিশুরা চঞ্চল স্বভাবের হয়ে থাকে। কিন্তু ওজনহীনতায় ভুগতে থাকা শিশু অল্পতেই নিস্তেজ হয়ে পড়ে ও দুর্বল হয়ে যায়।
  • রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাঃ পুষ্টিকর খাদ্যের অভাবে শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমতে থাকে, সহজেই বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়।
  • মানসিক স্বাস্থ্যঃ শিশুরা যখন তাদের প্রয়োজনীয় পুষ্টিমান সমৃদ্ধ খাবার পায় না তখন শিশু মানসিক বিষণ্ণতায় ভুগে ও তাদের মধ্যে অবসাদ দেখা যায়।

বিভিন্ন বয়সে শিশুর খাবার গ্রহণে ভারসাম্য আনা উচিত।  শিশুর একটি সুস্থ জীবনের জন্যে খাবার তালিকাটা এমন হওয়া প্রয়োজন যেন সবরকম খাবারের সমন্বয় থাকে। দেখে নেয়া যাক একটি শিশুর জন্যে উপযোগী খাবার তালিকা।

০-৫ বছর বয়সের শিশুর খাদ্য তালিকা

বয়স খাবার উপাদান
০-১ বছর প্রথম ৬ মাস মায়ের বুকের দুধ হচ্ছে শিশুর একমাত্র খাবার। এরপর ধীরে ধীরে ফলের রস, গলানো খিচুড়ি খাওয়ানোর অভ্যাস করতে হবে।
১-২ বছর প্রোটিনঃ নরম করে ছোট করে কাটা মাংস, ছোট মাছ, ডিম, দই।

চর্বিঃ মাখন, নারকেল।

শর্করাঃ  রুটি, কর্ণ।

ভিটামিন ও মিনারেলসঃ আধা কাপ রান্না করা টুকরো সবজী এবং আধা কাপ ফলের রস।

ফাইবারঃ রুটি, মসুর ডাল, দানাদার শস্য, মটরশুটি।

৩-৫ বছর বড় হয়ে ওঠার সাথে সাথে শিশুকে শক্ত খাবার খাওয়ানোর চর্চা করতে হবে। তখন বাড়ির সকল সদস্যের মতো খাবার দেওয়া যাবে। খাবারের উপাদান গুলো মূলত এক থেকে দুই বছরের বয়সের মতো রেখেই পরিমাণ তুলনায় বাড়িয়ে দিতে হবে। শিশুর বৃদ্ধির কথা মাথায় রেখে শর্করা ও প্রোটিনের পাশাপাশি মিনারেলস ও ভিটামিনের দিকে আলাদা গুরুত্ব দিতে হবে।

 

বাড়ন্ত শিশুর জন্যে উপযোগী  খাদ্যের ৭টি ভিন্ন উপাদানের সমন্বয়ে তৈরি খাদ্য তালিকা 

শর্করাঃ

শিশুর শরীরে শক্তি যোগাতে সাহায্য করে শর্করা। শ্বাসপ্রশ্বাস, খাবার হজম করা, মলমূত্র নিষ্কাশণের ক্ষেত্রে শর্করার ভূমিকা সর্বাধিক।

শিশুর খাবারে শর্করার উৎসঃ মিষ্টি, মধু, আম, আলু, মিছরি, সাগু, বার্লি।

প্রোটিনঃ

শারীরিক গঠন ও হজম ক্রিয়া নিয়ন্ত্রণের পেছনে কাজ করে প্রোটিন। দেহে তাপ উৎপাদনের সাথে সাথে কোষের ক্ষতিপূরণেও ভূমিকা রাখে প্রোটিন।

শিশুর খাবারে প্রোটিনের উৎসঃ ডিম, মাছ, মাংস, পনির, ডাল, দুধ জাতীয় খাদ্য , ছানা।

চর্বিঃ

কোষ গঠন ও শক্তি সঞ্চারের জন্যে চর্বি যুক্ত খাদ্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এছাড়া চেহারায় লাবণ্য আনতে বাচ্চার জন্যে চর্বি যুক্ত খাদ্য প্রয়োজন।

শিশুর খাবারে চর্বির উৎসঃ মাংসের চর্বি, মাখন, তেল, ঘি, নারকেল।

মিনারেলসঃ

বিভিন্ন রকম মিনারেলস শিশুর শারীরিক গঠনে ভূমিকা রাখে। যেমনঃ ক্যালসিয়াম শিশুর হাঁড় ও দাঁত শক্ত করতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আবার ফসফরাস ক্যালসিয়ামের সাথে মিলিত হয়ে শিশুর হাঁড় ও দাঁতের টিস্যু গঠনে কাজ করে। রক্তে হিমোগ্লোবিন তৈরির জন্য আয়রন ও শিশুর মানসিক বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখে আয়োডিন। হার্টের সচলতা বজায় রাখতে সাহায্য করে ম্যাগনেসিয়াম।

শিশুর খাবারে মিনারেলসের উৎসঃ ডাল, দুধ , ডিম, পনির, কলিজা, চিংড়ি, গাজর, আপেল।

ফাইবারঃ

শিশুর ভবিষ্যৎ জীবনে হৃদরোগ ও ক্যান্সার হওয়ার সম্ভাবনা কমাতে ভূমিকা রাখে ফাইবার।

শিশুর খাবারে ফাইবারের উৎসঃ মসুর ডাল, দানাদার শস্য, মটরশুটি।

ভিটামিনঃ

শিশুর শারীরিক ও মানসিক বিকাশে ভিটামিনের ভূমিকা উল্লেখযোগ্য। ভিটামিন ‘এ’ শিশুর দৃষ্টিশক্তি স্বাভাবিক রাখতে ও ভিটামিন ‘বি’ শিশুর স্বাভাবিক বৃদ্ধিতে কার্যকরী ভূমিকা পালন করে। পাশাপাশি ভিটামিন ‘সি’ রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায় ও ভিটামিন ‘ডি’ শিশুর হাঁড় ও দাঁত মজবুত করে। । ভিটামিন ‘এ’ ও ‘কে’ মাংসপেশি শক্তিশালী করে ও রক্ত জমাট বাঁধতে কাজ করে।

শিশুর খাবারে ভিটামিনের উৎসঃ

ভিটামিন ‘এ’ – পাকা পেঁপে, মিষ্টি কুমড়া, ছোট মাছ।

ভিটামিন ‘বি’ – মাংস, গুড়, চিড়া, মুড়কি।

ভিটামিন ‘সি’ – লেবু, আমলকি, কমলা, জলপাই, কামরাঙ্গা, পেয়ারা।

ভিটামিন ‘ডি’ – পনির, মাখন, ঘি, দুধ-ডিম, কলিজা।

ভিটামিন ‘ই’ – এবং ভিটামিন ‘কে’ – ডিমের কুসুম, মাংস, চিনা বাদাম, সবুজ ও হলুদ শাক-সবজি।

পানিঃ

দেহের তাপমাত্রা রক্ষার জন্যে শিশুকে যথেষ্ট পরিমাণ পানি পান করানো প্রয়োজন। এছাড়া খাবার হজম ও অপ্রয়োজনীয় পদার্থ বের করে দিতে পানি যথেষ্ট ভূমিকা রাখে।

সতর্কতাঃ

হজমের কথা মাথায় রেখে শিশুকে কিছু খাবার দেওয়ার পূর্বে সাবধান হতে হবে।

গরুর দুধ-

শিশুর একবছর বয়সের পূর্বে গরুর দুধ খাওয়ানো সম্পূর্ণ নিষেধ। আয়রন ও ফ্যাটি এসিড শিশুর বৃদ্ধির জন্যে অতি গুরুত্বপূর্ণ যা গরুর দুধে মায়ের বুকের দুধের তুলনায় অনেক কম পরিমাণে থাকে।

কিসমিস-

কিসমিসে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন থাকলেও শিশু বয়সে তা হজমের সমস্যার কারণ হয়ে থাকে। এক বছর বয়সের আগে শিশুকে কিসমিস দেয়া যাবে না।

মধু-

আমাদের দেশের প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী জন্মের পরপরই শিশুর মুখে মধু দেয়ার নিয়ম থাকলেও এক বছরের পূর্বে তা কখনোই খাওয়ানো উচিত নয়। 

জেলি-

শিশুরা জেলি দিয়ে রুটি খেতে অনেক পছন্দ করে। কিন্তু জেলি দাঁতের ক্ষতি করে এবং শিশুর হজম শক্তিও কমিয়ে ফেলে।

লবণ-

লবণ শিশুর কিডনির উপর ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে। পরিপাক ক্রিয়ায় ব্যাঘাত ঘটায় লবণ। এক বছরের পর অল্প অল্প করে বাচ্চার খাবারে লবণ যোগ করতে হবে।

বাদাম-

বাদাম পুষ্টিকর খাবার হলেও কিছু ক্ষেত্রে অ্যালার্জির সৃষ্টি করে থাকে। তাই, বাচ্চার এক বছরের পূর্বে বাদাম না দেওয়াই ভালো।

চকলেট-

শিশুরা চকলেট পছন্দ করলেও চকলেটের মূল উপাদান কোকো, যা দাঁতের ভয়াবহ ক্ষতি করে থাকে। এছাড়া ভবিষ্যতে শিশুর অ্যালার্জির কারণ হতে পারে এই চকলেট।

বাড়ন্ত বয়সে শিশুরা দুরন্ত প্রকৃতির হয়ে থাকে। তখন চাই শিশুর বাড়তি পুষ্টি। এজন্য শিশুর শারীরিক ও মানসিক বৃদ্ধির জন্যে দৈনন্দিন খাদ্যাভাস মেনে চলাটা অত্যন্ত জরুরী।

 

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *