শিশুর খেলনা নির্বাচনে সতর্কতা

শিশুর পছন্দের তালিকায় প্রথমেই জায়গা করে নেয় খেলনা। খেলনার সাথেই কাটে দিনের সবচেয়ে বেশি সময়। ‘শিশুর পছন্দ’ ও ‘বয়স উপযোগী খেলনা’ দুই বিষয়কে মাথায় রেখেই শিশুর জন্যে খেলনা নির্বাচন করতে হবে।

 

শিশুদের খেলনার ব্যাপারে সতর্কতা

শিশুদের হাতে খেলনা তুলে দেওয়ার পূর্বে কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মাথায় রাখা প্রয়োজন।

  • শিশুদের অভ্যাস যেকোনো কিছু হাতের কাছে পেলেই তা মুখে দেয়া। তাই শিশুরা যখন কোনো খেলনা মুখে দেয় তার সাথে জীবাণু শিশুর পেটে চলে যেতে পারে, যা হতে পারে শিশুর বিভিন্ন রোগের কারণ।
  • শিশুদের জন্যে খেলনার আকার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার। খেলনার আকার হাতের তুলনায় ছোট হলে শিশুর মুখে ঢুকে যেতে পারে।
  • শিশু বয়সের অনুপযোগী কিছু খেলনা, যেমন ক্যামেরা বা মোবাইল ছোটবেলায় হাতে পেলে তা ভবিষ্যতে শিশুর আচরণে ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে।
  • হাতের কাছে পাওয়া ধারালো খেলনা বা বস্তুর সাহায্যে শিশু নিজেকে আহত করতে পারে। তাই, শিশুর কাছ থেকে শুধু ধারালো খেলনাই না যেকোনো রকম ধারালো জিনিস সরিয়ে রাখতে হবে।
  • শিশুদের হাতে বয়স উপযোগী খেলনা তুলে দেওয়া আবশ্যক। প্রতিটি খেলনার সাথে তার জন্যে উপযুক্ত বয়সসীমা দেওয়া থাকে। সেই বয়সসীমা অনুযায়ী শিশুকে খেলনা কিনে দিতে হবে।

 

শিশুর জন্যে বয়স উপযোগী খেলনা-

বয়স উপযোগী খেলনা
০-১ শিশুদের জন্যে হাতের আঁকার অনুযায়ী খেলনা গাড়ি বা রঙচঙা বই, ফোম বা প্লাস্টিকের বিল্ডিং সেট কিনে দিন। কেনার পূর্বে অবশ্যই খেলনার বয়সসীমা দেখে নিন। এ বয়সে শিশুকে রঙিন খেলনা তুলে দিন, তাতে করে শিশুর রঙের বিষয়ে ধারণা জন্মাবে।
১-৩ ধীরে ধীরে শিশু বড় হতে থাকে। এ বয়সে বল, পুতুল, লেগো সেট শিশুর জন্যে উপযুক্ত খেলনা। পাশাপাশি শিশুর মানসিক বিকাশের জন্যে রঙ পেন্সিল ও ক্রেয়ন তুলে দিন। এ বয়সে শিশুদের ছবি আঁকার প্রতি আগ্রহ জন্ম নেয়।
৩-৫ দলীয় খেলার প্রতি শিশুকে আগ্রহী করে তুলতে এ বয়সে প্লাস্টিকের ক্রিকেট সেট বা ফুটবল দেওয়া উচিত। এর সাথে বিভিন্ন রকম পাজল সেট দেওয়া যায় যা শিশুর বুদ্ধির বিকাশে ভূমিকা রাখে।

 

  • শিশুর জন্যে গাদাখানেক খেলনা না কিনে দিয়ে বরং শিশুকে একটি খেলনার মাধ্যমেই কিভাবে বিভিন্ন উপায়ে খেলা যায় তা শেখান। তাতে শিশু খেলনার প্রতি আসক্ত না হয়ে খেলার প্রতি আগ্রহী হয়ে উঠবে।
  • খেলনা রাখার জন্যে বাক্স ব্যবহার করুন, বাক্সের গাঁয়ে খেলনার ছবি লাগিয়ে দিন। এতে বাচ্চারা খেলনা খুঁজে পেতে ও গুছিয়ে রাখতে শিখবে।
  • শিশুকে খেলনার যত্ন নিতে শেখান। এতে করে শিশু নিজের জীবনেও অন্যান্য ব্যাপারে যত্ন নেওয়ার অভ্যাস গড়ে উঠবে।
  • খেলনা কেনার আগে তার উপকরণ ভালোভাবে দেখে নিতে হবে। খেলনায় যুক্ত থাকতে পারে বিভিন্ন ধাতব পদার্থ যা শিশুর পেটে প্রবেশ করলে পেটে ব্যথা, বমি ও অস্থির ভাব দেখা দিতে পারে। জাতীয় অধ্যাপক এম আর খান শিশুদের খেলনার বিষাক্ততার বিষয়ে বলেন, “লেড, ক্যাডমিয়াম, ব্রোমিন, ক্রোমিয়ামের মতো বিষাক্ত কেমিক্যাল শিশুদের জন্য অনেক ধরনের ক্ষতির কারণ হতে পারে”।

 

ভবিষ্যতে শিশুর কিডনি ও লিভার নষ্টের কারণ হতে পারে খেলনায় যুক্ত থাকা ধাতব পদার্থ।

ঢাকা শহরের প্রায় ৪০টি দোকান ঘুরে বিভিন্ন খেলনার নমুনা সংগ্রহ করে তাতে বিভিন্ন  ধরণের বিষাক্ত ধাতুর উল্লেখযোগ্য পরিমাণ উপস্থিতি পাওয়া গেছে। নিচের ছকে প্রাপ্ত তথ্য তুলে ধরা হলো-

ধাতুর নাম খেলনায় গড়

প্রাপ্ত পরিমাণ (পিপিএম)

ইউরোপীয় স্ট্যান্ডার্ড (পিপিএম) অতিরিক্ত মাত্রা
লেড ৪০১.৭৮ ১৩.৫ ৩০ গুণ বেশি
ক্যাডমিয়াম ১৮.৪৮ ১.৯ ১০ গুণ বেশি
ক্রোমিয়াম ৩৩০.৪৪ ৩৭.৫ ৯ গুন বেশি

তথ্যসূত্রঃ এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন (ইএসডিও)

 

শিশুর উপর খেলনার প্রভাবঃ

শিশুদের ছোটবেলার সবচেয়ে কাছের সঙ্গী হয়ে থাকে খেলনা। একটি শিশুর মানসিকতার উপরে খেলনা বিভিন্নভাবে প্রভাব ফেলতে পারে।

  • ব্যক্তিত্ব– খেলনার ধরণ শিশুর মানসিকতায় প্রভাব ফেলে। শিশু বড় হতে থাকলে শিশুর ব্যক্তিত্বে তার ছাপ পড়ে।
  • মানসিক বিকাশ– শিশুর বুদ্ধি বিকাশে খেলনা গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা পালন করে। বিভিন্ন ব্রেইন বুস্টিং খেলা (লুডু,দাবা, পাজল গেম, কিউব) শিশুর মানসিক বিকাশে প্রভাব ফেলে।  ‘
  • শিশুর পছন্দ– একটি শিশুর জীবনে প্রথম পছন্দ করে কেনা উপকরণ তার খেলনা। খেলনার বিষয়ে তাই শিশুদের আবেগ কাজ করে। খেলনা কেনার সময় নিজের পছন্দের চেয়েও শিশুর পছন্দকে বেশি গুরুত্ব দিন।  

 

শিশুদের পছন্দের কিছু বহুল প্রচলিত খেলনা

কিছু প্রচলিত খেলনা রয়েছে যা বাবা-মায়েরা তেমন চিন্তা ছাড়াই শিশুর হাতে তুলে দেন। অথচ এসকল খেলনার রয়েছে কিছু মারাত্মক ক্ষতিকর দিক।

  • লেগোঃ শিশুদের সবচেয়ে পছন্দের খেলনার একটি হলো লেগো। আকারে ছোট হলে অনেক সময় মুখে ঢুকিয়ে ফেলে যা শিশুর গলায় আটকে ভয়াবহ পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে।
  • খেলনা বন্দুকঃ অনেক সময় খেলনা বন্দুক দিয়ে খেলতে গিয়ে আহত হতে পারে শিশুরা। পাশাপাশি এমন খেলনা মানসিকভাবেও শিশুর উপর প্রভাব ফেলে।
  • ক্যামেরা / মোবাইল ফোনঃ অনেক সময়েই শিশুকে শান্ত করার জন্যে বাবা-মা ছোটবেলাতেই শিশুদের হাতে স্মার্টফোন, ট্যাব বা প্যাড তুলে দেয়। এতে করে শিশু অল্প বয়সেই এসব ডিভাইসের প্রতি আসক্ত হয়ে পড়ে।
  • রিমোট কন্ট্রোল গাড়ি: বর্তমানে খেলনা গাড়ি তৈরির উপাদান হিসেবে ব্যবহার হয় ধাতব পদার্থ যা শিশুর জন্যে ক্ষতিকর।
  • বারবি পুতুলঃ বিভিন্ন রকম খেলনা পুতুল শিশুদের মনে প্রভাব ফেলে। এতে কল্পনার জগতে শিশুরা এমনভাবে বাস করতে শুরু করে বাস্তব জীবনের অনেক কিছুই তার চোখে পড়ে না। যার প্রতিফলন শিশুর ভবিষ্যৎ জীবনে দেখা যায়।
  • অ্যাকশন ফিগারঃ কার্টুন ও কমিকের মাধ্যমে শিশুরা বিভিন্ন অ্যাকশন ফিগারের সাথে পরিচিত হয়ে ওঠে। কিন্তু কল্পনার জগত থেকে উঠে আসা চরিত্র (স্পাইডার ম্যান, সুপার ম্যান, ব্যাট ম্যান) অনেক সময়েই শিশুদের আচরণে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
  • ব্যাটারি যুক্ত খেলনা– ব্যাটারিযুক্ত খেলনা ছোটদের বেশ প্রিয় হয়। এসব খেলনায় আলো জ্বলে, আওয়াজ হয়; যা শিশুরা পছন্দ করে থাকে।  আলো জ্বলা এমন খেলনার জন্যে ব্যবহৃত হয় খুদে ব্যাটারি যা শিশুরা খেলাচ্ছলে নিজের নাকের ভেতর ঢুকিয়ে ফেলে। ক্ষারযুক্ত এমন ব্যাটারি বের করা হলেও রাসায়নিক বিষক্রিয়ার ফলে যে ক্ষতি হয়ে যায় তাতে শিশুর ঘ্রাণশক্তি সারাজীবনের জন্যে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

 

খেলতে খেলতেই শিশু শিখে। খেলনা শিশুর বুদ্ধির বিকাশে ভূমিকা রাখে তাই শিশুর জন্যে সৃজনশীল খেলনা কিনতে হবে। তাই, শিশুদের হাতে এমন খেলনা তুলে দেওয়া উচিত যা আনন্দ দেওয়ার পাশাপাশি মানসিক বিকাশেও  সাহায্য করে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *